প্রকাশিত: ২০ অক্টোবার, ২০২৫, ১২:৪৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় ২০ শতাংশই মেডিকেল বর্জ্য। ঢাকায় দৈনিক তৈরি ১৪ টন মেডিকেল বর্জ্য, অব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য।
প্রায় ১৮ কোটি মানুষের চিকিৎসা চাহিদা মেটাতে যেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদ ব্যবস্থাপনার অভাব জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর এক গুরুতর বিপর্যয় ডেকে আনছে। আধুনিক এ প্রযুক্তির মেশিনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাত্র ৩০ মিনিটেই মেডিকেল বর্জ্যকে সাধারণ বর্জ্যে পরিণত করা সম্ভব। এতে করে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখে, অন্যদিকে এটি পরিবেশবান্ধবও। এ নিয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরামর্শক ড. নাসির খান পাঠিয়েছেন তার সুচিন্তিত পরামশর্ক একটি লেখা তা এখানে তুলে ধরা হলো :
Wikipedia, ২০২৩ এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ৫৮১৬ টি সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালু আছে। বর্তমানে এর সংখ্যা হয়ত আরও অনেক বেশী। অপরদিকে Association of Bangladesh Private Clinic and Diagnostic centre এর হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭৪৬৫ টি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগন্সটিক সেন্টার তালিকাভুক্ত আছে। আবার এর বেশীর ভাগই ঢাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে আনুমানিক ১৬৪৩৮ টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং প্রায় ৩০০০০ সেটেলাইট ক্লিনিক স্থাপন করেছেন। এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয় যা প্রতিদিন এলোমেলোভাবে সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হয়। খুব কম সংখক হাসপাতালেই বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থাপনা স্থাপিত আছে।
হাসপাতাল হতে উৎপন্ন বর্জ্য সঠীক ও স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হলে, তা জনসাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়। সাধারনত, প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে জনপ্রতি (রুগী হিসাবে) দৈনিক ০.২০ কেজি থেকে ০.৫০ কেজি পর্যন্ত বর্জ্য উৎপন্ন হয়ে থাকে। উৎপন্ন সব বর্জ্যই জনস্বাস্থ্যের জন্য সমান ক্ষতিকারক এমন নয়, এর মধ্যে মাত্র ১৫-২০% উৎপন্ন বর্জ্য জনসাস্থের জন্য খুব ক্ষতিকর হয়ে থাকে। কিন্তু, উৎপন্ন বর্জ্য সঠিকভাবে উৎপত্তিস্থলে পৃথকিকরনের (Segregation at source) মাধ্যমে সংগ্রহ করা না হলে, সব বর্জ্যই ক্ষতিকারক হিসাবে পরিণত হয়ে থাকে। সাধারণতঃ হাসপাতাল বর্জ্যের সরাসরি বা পরোক্ষ সংস্পর্শ থেকে নানারকম জটিল রোগব্যাধি সমাজে ছড়াতে পারে, তা এমনকি হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি/এইডস এবং ক্যানসার ও।
শুধুমাত্র হাসপাতাল থেকেই এসব রোগবালাই ছড়ায় তা না, বরং বিক্ষিপ্ত ভাবে হাসপাতাল বর্জ্য...
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উৎপত্তিস্থলে পৃথকিকরন (Segregation at source) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা না হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপ্তি এবং খরচ দুইই বৃদ্ধি পাবে। পৃথকিকরনের পর, উপরোক্ত ছক অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
মুলতঃ ইনসিনারেশন (Incineration) হচ্ছে ৮৫০-১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বর্জকে ভস্মিভুত করণ বা পুড়িয়ে ফেলা, আর অটোক্লেভিং (Autoclaving) হচ্ছে বাষ্পের উপস্থিতিতে নির্ধারিত তাপে (১২১-১৩৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) ও চাপে (১৫ পি এস আই) বর্জ্যকে সিদ্ধ করে জীবাণু মুক্ত করা ( অনেকটা প্রেশার কুকারের মত )। হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উপরোক্ত দুইটিই মূল পদ্ধতি।
আজকাল, ছোট বড় সব আকারের ইনসিনারেটর (Incinerator) বা অটোক্লেভ (Autoclave) আন্তর্জাতিক বাজারে পাওয়া যায়। ফলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ সব প্রকল্প যে কোন হাসপাতাল একক ভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে, সরকারি নির্দেশনাই যথেষ্ট। অনেকে মনে করেন, ইনসিনারেটর পদ্ধতি ব্যাবহারে বায়ু দূষণ হয়, কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়, উন্নত প্রযুক্তির ইনসিনারেটর ব্যাবহার করলে তাতে ইউরোপিয়ান মানমাত্রার বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংযুক্ত থাকে। অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির অটোক্লেভে শ্রেডার (Shredder) সংযুক্ত থাকে যাতে বর্জ্যগুলি পরিশোধনের পর ছোট ছোট টুকরা আকারে বের হয় যাতে কেউ এর পুনঃব্যবহার করতে না পারে।
অনেকে মনে করে থাকেন, শুধুমাত্র অটোক্লেভ ব্যবহার করে পুরাপুরি হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায় । কিন্তু আসলে তা সত্যি না, যেমন অস্ত্রোপচার থেকে উৎপন্ন মানবদেহের অংশবিশেষ, অব্যবহৃত, বাতিক্রিত বা মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ, সুই ও ব্যবহৃত ধারালো সামগ্রী ইত্যাদি ইনসিনারেশন করা জরুরী। তাই ইনসিনারেটর এবং অটোক্লেভ সমন্বয়ে অথবা শুধুমাত্র ইনসিনারেটর ব্যবহার করে হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রকল্প গ্রহন করতে হবে।
ভারতে অনেকস্থানে শুধুমাত্র অটোক্লেভ ব্যাবহার করার প্রচলন আছে। এই ক্ষেত্রে তারা হলুদ তালিকার বর্জ্য মাটির নীচে পুঁতে রাখে, আর নীল এবং কালো তালিকার বর্জ্য অটোক্লেভ করে। তাতে পরবর্তীতে এই ধারালো এবং বাতিক্রিত বা মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ সংক্রান্ত বর্জ্য থেকে পুনরায় সংক্রমণ হওয়ার আশংকা থাকে।
ইউরোপে বেশিরভাগ দেশ শুধুমাত্র ইনসিনারেটর ব্যবহার করে (যেমন যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ইত্যাদি), আবার কিছু দেশ ইনসিনারেটর এবং অটোক্লেভ দুটিই ব্যবহার করে থাকে (যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি)। তবে, কোন সংস্থা বা সরকার যদি গৃহস্থালী বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Municipal Waste to Electricity) প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তবে হাসপাতালের সব ধরনের বর্জ্য ও একই সাথে পুড়িয়ে ফেলা যাবে।
একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র যন্ত্রপাতি স্থাপন নয়, এটি একটি সমন্বিত পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। এখানে বর্জ্য সংগ্রহ থেকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত জড়িত সবাইকেই যথাযথভাবে প্রশিক্ষন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনার কাজ দক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এইমুহূর্তে, জনসাস্থের কথা বিবেচনায় রেখে অনতিবিলম্বে হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রকল্প গ্রহন করা জরুরী।
মন্তব্য করুন