সিলেট ব্যুরো

প্রকাশিত: ৪ জুন, ২০২৪, ০৪:২৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

রাতে টানা বৃষ্টি

সিলেটে তলিয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিংমল

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

গেল সপ্তাহে উজান থেকে ঢল নামার সাথে সাথে সিলেট শহরে পানি উঠতে শুরু করেছিল। জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল নগরীর কয়েকটি এলাকা। তারপর কয়দিন বৃষ্টি না হওয়ায় পানি ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু রোববার রাত থেকে মুশলধারে আবার বৃষ্টি শুরু হয়। যেসব এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছিল, আবার সেসব এলাকা দ্রুত তলিয়ে যেতে থাকে। একটানা বৃষ্টির কারণে আক্রান্ত হয় নূতন এলাকাও। তলিয়ে যাওয়া থেকে বাদ যায় নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিংমলও। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পানি উঠে পড়ায় ব্যহত হয় চিকিৎসা। প্রায় দুশ রোগীকে সরিয়ে নেয়দ হয় অন্যত্র। সিলেট নগরীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত উপশহর এলাকার বেশিরভাগ বাসা-বাড়ি, সড়ক মধ্যরাতেই পানির নিচে ডুবে যায়। ব্যহত হয় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

সিলেট নগরীতে পয়োনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় এ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিতে যখন-তখন জলাবদ্ধতা দেখা দিলে নানান উদ্যোগ নেয় সিলেট সিটি করপোরেশন। কিন্তু কার্যত কোনো উন্নতি হয়নি। বড় দাগে কিছু প্রকল্প সিলেট সিটি করপোরেশন হাতে নিলেও তার সুফল পাননি নগরবাসী। ফলে বরাবরের মত এবারও বৃষ্টি শুরু হতেই জলাবদ্ধতার মুখে পড়ল মহানগরী সিলেট।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, সিলেটে গেল রোববার রাতে বৃষ্টি হয়েছে ২৫৩ মিলিমিটার।  এতেই তলিয়ে গেছে মহানগরের বিভিন্ন এলাকা। বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নগরীর মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদী।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সুরমা নদীর  সিলেট পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে, কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে, কুশিয়ারার অমলসিদ পয়েন্টে সকার ৬টায় বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। 

সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, রেববার রাত ১২টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ২৮ মিলিমিটার ও ৯টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত ১৯.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও সুরমার পানি শহরে প্রবেশ করায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৬টায়) নতুন নতুন এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, মধ্যরাতের অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি উপচে সিলেট নগরীতে প্রবেশ করে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন  সিলেট নগরীর বেশকিছু এলাকার বাসিন্দারা। রোববার দিবাগত রাতে সিলেট নগরীর উপশহর, যতরপুর, মেন্দিবাগ, জামতলা, তালতলা, শেখঘাট, কলাপাড়া মজুমদার পাড়া লালদীঘির পাড়, সোবহানীঘাটসহ অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
হঠাৎ মধ্যরাতে বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় হতভম্ব হয়ে পড়েন নগরের বাসিন্দারা। শহরাঞ্চলে এমনিতেই জরাজীর্ণ পরিবেশে বেশিরভাগ মানুষের বসবাস তার ওপর এই বন্যা তাদের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

সিলেট নগরীর মিরেরময়দান এলাকার কেওয়াপাড়ায় বসবাসকারী সাংবাদিক নাসির উদ্দীন বলেন, এমনিতেই ভারত থেকে নেমে আসা উজানি ঢলে  সিলেটের বেশ কয়েকটি উপজেলায় অবস্থা ভয়াবহ। এরমধ্যে সুরমা নদীর পানি টইটুম্বুর করছে কয়েকদিন থেকে। আজ টানা বৃষ্টিতে আমাদের ঘরে পানি উঠেছে। নগরের জামতলা এলাকার বাসিন্দা অনুপ চক্রবর্তী জানান, বাসায় হাঁটুপানি। আসবাবপত্রসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র পানিতে তলিয়ে গেছে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর যদি নদী খনন করা হতো তাহলে আমাদের মতো বাসিন্দাদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।

এর আগে রোববার বিকেলে  সিলেট নগরীর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টি জানিয়েছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)  সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ। তার বরাত দিয়ে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, রোববার বিকেল তিনটা পর্যন্ত  সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপদসীমা থেকে ১ সে.মি. নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু রাতের এই অতি বৃষ্টিতে নতুন করে বন্যার শঙ্কা উকি দিচ্ছে।

এদিকে সিলেটে গেল ২৪ ঘন্টার অতিবৃষ্টিতে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিচতলা তলিয়ে গেছে। সোমবার (৩ জুন) ভোর থেকে হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকতে শুরু করে। ঘুমন্ত রোগী ও স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ফ্লোর, বারান্দা ও প্রবেশপথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন তারা। কর্তৃপক্ষ জরুরী ভিত্তিতে ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ২ শতাধিক রোগীকে স্থানান্তর করেন। পানি প্রবেশ করায় বন্ধ হয়ে পড়ে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা কার্যক্রম। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী জানান, বানের পানি প্রবেশ করাই চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। রক্ত সঞ্চালন বিভাগ এবং প্যাথলজি বিভাগে পানি প্রবেশ করায় এখনকার কার্যক্রমও বন্ধ। কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা সেবা স্বাভাবিক করতে কাজ করে যাচ্ছে।

মন্তব্য করুন